Posts

খানাপিনা

আপনি যদি নিজেকে সাধারণ ও সাভাবিক মানুষ বলে মনে করেন তবে আপনার জেনে রাখা উচিৎ যে, একজন মানুষ গড়ে তার সারা জীবনে ৬০,০০০ পাউন্ড খাবার খায় যা কিনা ছয়টা হাতির সারা জীবনের খাবারের সমান! এতো গেল তথ্যের কথা এবার চলুন ঘটনায়। ঈশ্বরচন্দ্ৰ বিদ্যাসাগর ছিলেন অত্যন্ত ভোজন রসিক। তিনি যেমন খেতে ভালোবাসতেন তেমনি খাওয়াতে। মাঝেমধ্যেই তিনি তার বন্ধুদের রেঁধে খাওয়াতেন আর পরিবেশনের সময় ছড়া কাটতেন – ‘হুঁ হুঁ দেয়ং হাঁ হাঁ দেয়ং দেয়ঞ্চ করকম্পনে শিরসি চালনে দেয়াং ন দেয়ং ব্যাঘ্ৰঝম্পনে ৷’ এহেন বিদ্যাসাগর একবার তার বন্ধুদের নিয়ে একটা সংগঠনই করে ফেললেন, নাম রাখলেন ‘ভোজনসভা’। এই সংগঠনের কাজ হচ্ছে চেনা পরিচিতদের বাড়িতে হঠাৎ হামলা করে খাওয়ার আবদার করে বসা। এই সংস্থার নাম ছড়িয়ে পড়েছিল ঘনিষ্ঠ মহলে। তাই প্রত্যেকেই সদা প্ৰস্তুত থাকতেন – এই বুঝি এল ভোজনসভার সভ্যারা! একবার ঘটল এক কান্ড। ভোজনসভার সভ্যরা দল বেঁধে এক বন্ধুর বাড়িতে বেশ ঘটা করে খাওয়া দাওয়া করলেন। খাওয়া-দাওয়ার পরের দিন সংস্থার এক সদস্যের পেটের অসুখ হল। বেশ কয়েকদিন তার দেখা নেই। কিছুদিন পর সুস্থ হয়ে সদস্যটি এলেন ভোজনসভায়। বন্ধুরা তাঁকে নিয়ে ঠ...

আঙুর ফল টক

অনেক দিন পরে সুবর্ণার সাথে দেখা। একটা বিয়ের অনুষ্ঠানে। সাথে ওর স্বামী আর চার-পাঁচ বছরের একটা বাচ্চা। মোটামুটি আগের মতই দেখতে এখনো। তবে শরীরটা কিছুটা ভারি হয়ে গেছে। খেয়াল করলাম হাঁটার সময় কেমন হাঁসের মত হেলেদুলে হাঁটছে। দেখতে খারাপ লাগছে না ব্যপারটা। কিন্তু ওর হাঁটা দেখলেই বারবার ‘দোল দোল দুলুনি’ গানটা মনে পড়ছে। ওই প্রথম আমাকে দেখে ডাকল – ‘সুমন, এই সুমন’। খালি পকেটে রাস্তায় বেরিয়ে দুশো টাকা কুড়িয়ে পেলে যেমন অদ্ভুত আনন্দ হয় ওকে দেখার পর আমারও সেরকম আনন্দ হল। ‘আরে তুমি এখানে’? চোখ-মুখে বিস্ময় নিয়েই জিজ্ঞেস করলাম। ‘হু, কতদিন পরে দেখা তাই না’? ‘হ্যাঁ’… অনেকক্ষণ চলল আমাদের কথা। আমাকে ওর স্বামীর সাথে পরিচয় করিয়ে দিল আর বাচ্চাটির সাথে আমাকে পরিচয় করিয়ে দিল মামা বলে। ভাবা যায়! অথচ এই সুবর্ণাকেই আমি একদিন কত চাইতাম মনে মনে। ওর বাচ্চাটি বেশ চঞ্চল প্রকৃতির। এক যায়গায় স্থির থাকতেই রাজি নয়। তাই ওর স্বামী হাঁটার জন্য বাচ্চাটিকে নিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে গেল। আমরা দুজনে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলাম। সুবর্ণার চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকাতে আমি ভাবলাম এবার আমার যাওয়া উচিৎ। কিন্তু হঠাৎ ওই নিরবতা ভাংল – ‘মনে আছে ভার্সিটিতে ...

বিবাহোত্তর কাব্য

শেষমেশ বিয়েটা করেই ফেলল ওরা, সেটাও দু’বছর আগের কথা। অবশ্য এটাই স্বাভাবিক ছিল। সকল প্রেমই একটা পরিনতি চায় আর সেই পরিণতিটা হচ্ছে বিয়ে। কথায় আছে বিয়ে একশ কথা নিয়ে। ওদের বিয়েতেও তাই হয়েছিল। অনেকেই রাজি ছিলনা শুরুর দিকে। কিন্তু পাত্র-পাত্রী নিজেরাই যেহেতু উদ্যোগী হয়ে মাঠে নেমে পড়ল তাই নিমরাজি সদস্যদের আর করার কিছুই থাকল না। ভালোয় ভালোয় বিয়ের ব্যপারটা উতরেও গেল। এর মধ্যে দেখতে দেখতে দুটি বছরও কেটে গেছে। সব ঠিকঠাকই চলছিল কিন্তু এদানিং পাত্রী মানে বর্তমানে যিনি স্ত্রী, তার বেশ অভিমান হতে দেখা যায়। তার অবশ্য বেশ জোড়াল কারণও আছে, বিয়ের আগে পাত্র মানে বর্তমানে যিনি বর, নিয়ম করে স্ত্রীর জন্যে কবিতা লিখত, সেগুলো আবার ফেসবুক মেসেঞ্জারে পাঠিয়েও দিত। প্রথম প্রপোজটাও কিন্তু কবিতা দিয়েই হয়েছিল। আমাদের গল্পের বর তার স্ত্রীকে লিখেছিল – যদি অনুমতি দাও তবে কাছি আসি বলতে চাই, ভালোবাসি, ভালোবাসি, ভালোবাসি… আর আজকাল? কাব্য টাব্য সব শিকেয় উঠেছে। বরটি কিইবা করবে? এখন তো আর একা নয় যে প্রোমোশনের চিন্তা বাদ দিয়ে কোনরকমে চাকরীটা করবে আর সঙ্গিনীর জন্যে কবিতা লিখবে। এখন তাকে ভাবতে হয় ভবিষ্যতের কথা। তাই চাকরীটা...

জলে ভাসা দ্বীপ

Image
চৌদ্দ শতকের আগ পর্যন্ত দক্ষিন আমেরিকার উরু (Uru) জাতীগোষ্টির লোকেরা হ্রদের কিনারে কাঠ, খড়, ছন ইত্যাদি দিয়ে নিজেদের তৈরি নৌকাতেই বসবাস করত; অনেকটা আমাদের দেশের বেদে সম্প্রদায়ের মতই। ডাঙায় বিচরণ আর নৌকায় ঘুম এই করে ভালোই কাটত যদি এমারা ইন্ডিয়ানরাও (Aymara Indians) একই এলাকায় বসবাস না করত। এমারা ইন্ডিয়ানরা ছিল দাঙ্গা হাঙ্গামায় উরুদের চেয়ে বেশি শক্তিশালী। তাই এমারা ইন্ডিয়ানদের সাথে উরুদের নিয়মিত ঝামেলা-মারামারি লেগেই থাকত। শেষমেশ এমারাদের সাথে না পেরে নিজেদের পুরোপুরি জলে নিয়ে যেতে বাধ্য হল উরু’রা। উরুদের তৈরি নৌকায় উরু রমণী চৌদ্দ শতকের শুরুর দিকের কোন একটা সময় উরু’রা বাসস্থান হিসেবে বেছে নিল ভাসমান দ্বীপ যা তারা তৈরি করেছে টিটিকাকা (Titicaca) হ্রদের উপর। ধীরে ধীরে বাড়তে থাকল দ্বীপের সংখ্যা। দ্বীপ তৈরির মূল উপাদান আঁখ গাছ। মজবুত করার জন্য ব্যবহার করা হয় গাছের ডালপালা, মূল আর কাণ্ড। শুধু দ্বীপ নয় উরুদের বাড়ি এমনকি তাদের ব্যবহারের নৌকাও আঁখ গাছ দিয়ে তৈরি। আঁখ গাছ পানিতে দ্রুত পোঁচে যায় তাই নির্ধারিত ব্যক্তিরা নিয়মিত ভাবে প্রতি মাসে আঁখ গাছ পরিবর্তনের কাজটি করে থাকে। এতো গেল উরু ...

কোরবানি বলে কথা

আর কয়েকদিন পরেই কোরবানির ঈদ বা ইদ। সেই উপলক্ষে সবাই নিজ দায়িত্তে রাস্তাঘাট, বাজার-মাঠ সর্বত্র ভিড় বাড়িয়ে চলেছে। এমনটা হওয়াই তো স্বাভাবিক। কোরবানির ঈদ বলে কথা। তবে এই ঈদে শপিংমলের চেয়ে গরু-ছাগলের হাটের দিকে মানুষের মনোযোগ থাকে বেশি। যার ফলে এই ঈদে গরু-ছাগল থেকে যোজন যোজন দূরে থাকা মানুষগুলোও হয়ে ওঠে পশু বিশেষজ্ঞ। যাই হোক কোরবানি নিয়ে যেহেতু কচকচানি শুরু হয়েই গেছে তো একটা গল্প বলি – এক লোকের ছিল একটি ছাগল আর একটি গাধা। ছাগলটার সারাদিনের কাজ ছিল খাওয়া আর আরাম করা অন্যদিকে গাধাটা সারাদিন ধরে বোঝা টানত তার উপরে একটু গড়বর হলে মালিকের মার তো আছেই। তো ছাগলটা একদিন গাধাটাকে ডেকে বলছে – তোকে দেখে আমার বড্ড মায়া হয়, বুঝলি? কেন? – গাধার প্রশ্ন। না মানে, তুই সারাদিন এতো পরিশ্রম করিস তার উপরে মার খাস আর আমি সারাদিন কত আরামে থাকি, কোন কাজ নেই শুধু খেয়ে খেয়ে মোটা হচ্ছি। ‘তোকে তো যত্ন করবেই… সামনে তো কোরবানির ঈদ।’ আরেকটা গল্প বলি। আমার এক ফেবু বন্ধু (নাম মনে নাই) এটা লিখেছে তার ওয়ালে। বাবা-ছেলের কথোপকথন – ছেলে – বাবা কোরবানির গরু কিনবেন না? বাবা – হ্যাঁ, তাতো কিনতেই হবে; গাধা তো আর কোরবানি দে...

দিন শেষে একা

লাল রংটা কল্যাণের বেজায় অপছন্দ। কিন্তু আজ এই রঙটাই ওকে দেখতে হবে অনেকক্ষণ। তারপর… হাতের ঘড়িটা একবার দেখেনিল কল্যাণ। তিনটা বেজে ছাব্বিশ। অনেক রাত। কিন্তু মোড়ের সিগারেটের দোকানটা এখনো খোলা। সারারাতই খোলা থাকে। খুব ইচ্ছে হচ্ছে গিয়ে একটা সিগারেট খেতে কিন্তু উপায় নেই, বাইরে বৃষ্টি হচ্ছে। এঘড়ে কোন ছাতা নেই। এত রাতে মায়ের রুমে গিয়ে ছাতা নিয়ে আসার প্রশ্নই আসে না। অগত্তা সিগারেটের চিন্তাটা বাদ দিতে হল। চিত হয়ে বিছানায় শুয়ে আছে ও। ভাবছে – এখনই শুরু করবে কি না। ভাবতে ভাবতে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল বুক চিড়ে। কত রঙিন মনে হত একসময় জীবনটাকে। মনে হত যত সমস্যা সব বড় হলেই ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু না বড় হওয়ার সাথে পাল্লা দিয়ে সমস্যাগুলোও আরও বড় হয়েছে। ও কাওকে বুঝতে দেয়না, দীর্ঘশ্বাসগুলো চাপা দিয়ে দেয় বুকের মধ্যে। মাঝে মাঝেই নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসতে চায় কিন্তু কাওকে বলে না। একটা সময় খুব একাকীত্বে ভুগতো ও। খুব একা একা লাগত; খুব। তারপর নিজেই একসময় আবিষ্কার করল – একাকীত্ব আসলে দুর্বলতা নয় শক্তি, a source of energy. কারন? কারনটা খুব সহজ। একা মানুষের হারানোর ভয় থাকে না। এমন নয় যে ওর পৃথিবীতে কেউ নেই। আছে সবাই ...

অসুখ

একগাদা ওষুধ লিখেছে ডাক্তার। সেগুলো নিতেই আজ এদিকটাতে আসা। নয়তো এদিকের এই ভিড়ের মধ্যে কে আসতে চায়। শহরের এদিকটায় আসার একটা ভালো দিকও আছে – এখানে প্রায় সব ওষুধ পাওয়া যায় তাও আবার পাইকারি দামে। ছোট দোকানটায় যায়গা বড়ই কম তবুও মানুষের উপচে পড়া ভিড়। পনের মিনিট হতে চলল দাঁড়িয়ে আছি তো আছিই। সিরিয়াল পাবার নাম গন্ধও নেই। অবশেষে কাউন্টারে গিয়ে দাঁড়ালাম। প্রেসক্রিপশনটা দোকানদারের হাতে দিলাম, ব্যস। এবার শুধু অপেক্ষার পালা। আমার বাঁদিকটায় দেয়াল, দোকানের শেষপ্রান্ত আর ডানপাশে দাঁড়িয়ে আছে এক বৃদ্ধ। তার ওষুধ নেওয়া বোধয় শেষ তবুও একবার মিলিয়ে দেখছে ঠিকঠাক আছে কি না। আমি সারি সারি করে সাজানো ওষুধের বাক্স দেখে দেখে নাম পড়ছি আর ভাবছি – সকল রোগের ওষুধ কি সত্যই পাওয়া যায়। হঠাৎ সিনিয়র একজন দোকানদার জুনিয়র একজনকে প্রশ্ন করল -‘ওই চাচা কি ট্যাকা দিছিল’? আমি ডানে তাকিয়ে দেখলাম বুড়ো নেই। ‘না তো ভাই’। জুনিয়র উত্তর দিল। ‘ট্যাকা না দিয়া গেল কই? জলদী যা, খুইজ্জা লইয়ায়।’ কিছুক্ষণ পর ছেলেটা সেই বৃদ্ধ লোকটিকে হাতে ধরে নিয়ে এলো। স্বাভাবিক ভাবেও নয় আবার ঠিক টানতে টানতেও নয়। তবে দেখে...